............ জকিগঞ্জের বাজারে এমন খবর মানূষের মুখে মুখে শুনে কেমন যেন স্বস্তি বোধ করতে লাগলো ইউনুস।
বর্ডারের পাশেই তার বাড়ী। মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙ্গে হতাশ হয়ে বসে ভাবে, যদি বাপ-দাদার ভিটা না হতো তবে কবেই এসব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে টাউনে গিয়ে রিক্সা চালানো শুরু করত- এভাবে বাচতে হতোনা।
বাগী আনা দুটো গাই-গরুকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশী দেখে শুনে রাখতে হয় ইউনুসের। একবার ওপারে গেলেই খেল প্রায় খতম অথবা নিদেন পক্ষে হাজার পাঁচেক টাকার ঝক্কি, তাইতো সবসময় চোখে চোখে রাখে অবোধ পশুদুটিকে।
গত রমজানে মেম্বারের গরুও তিন হাজারের নিচে ছাড়েনি শালার বিএসএফ।
বাজার থেকে বাকীতে কিছু চাল নিয়ে ফিরতে ফিরতে এসবই ভাবছিলো ইউনুস। পথে দেখা হয় পাশের গ্রামের বলাই'র সাথে, বিড়ি ভাগাভাগি করে হাটতে হাটতে বলাই তুলে ভয়ানক এক প্রস্তাব। মাত্র কয়েক ঘন্টার কাজ কিন্তু পুরা ৫০০ টাকার একটা কচকচে নোট। লোভ সামলানো দায়ই বটে।
কিছুনা, শুধু একটা বস্তা মাথায় নিয়ে যেতে হবে ওপারে আর আরেকটা বস্তা মাথয় নিয়ে আসতে হবে এপারে। এই ৫০০ টাকা থেকে বলাইকে দিতে হবে মাত্র ১০০ টাকা। যত হোক অনেকের মাঝ থেকে বলাই যে তার কথা মনে রেখেছে এটাই অনেক।
শুক্রবারের দিন-তারিখ ঠিক করে বিদায় নিলো বলাই, ইউনুসের বাড়ির সামনে থেকে,তার যে অনেক কাজ ফিরে যাবে বাজারে, মহাজনদের সাথে কত উঠা বসা এই বলাই'র।
রাতে বসে বসে ইউনুস ঠিক করলো এই টাকায় কি কি করবে। মা মরা মেয়েটাকে একটা ফ্রক দিয়ে পারেনি গেলো ঈদে, আর গোয়াল ঘরটারও মেরামত দরকার, কিন্তু এই টাকায় গোয়াল ঘরের কোন কাজই হবে না। ইউনুস ভাবে-বলাইকে বলে এই কাজটা যদি সব সময় করা যায়।
শুক্রবার আসে, ইউনুস রেডি। সন্ধার পর বলাই আসবে, নিয়ে যাবে ইউনুসকে। বলাই আসে, সাথে আরো দুজন। তারা সবাই রওনা হয়। মাইল দুয়েক হেঁটে বর্ডারের খুব কাছাকাছি পৌছে যায় তারা। ওখানে গিয়ে দেখে আরো কয়েকজন অপেক্ষা করছে তাদের, আর পাশে রাখা কয়েকটা বস্তা। এক একজন একটা করে বস্তা মাথায় তুলে নিলো। তাদের বলে দেওয়া হল ওপারে তাদের জন্য অপেক্ষায় আছে লোক, তারা এই বস্তা নিয়ে দিবে অন্য এক বস্তা। তাদের বলে দেওয়া হল শহিদ যা বলে তাই করতে।
বলাই বাদে সবাই রওনা দিলো।
ওপারে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না, শহিদ খুব ঝানু লোক, এ লাইনে নাকি প্রায় ১৫ বছর।
ফিরে আসতেই নাকি যত কষ্ট, ভয় জড়ো হতে থাকে ইউনুকের বুকে। একে একে পার হয় বিলাল, আমিন, সহ আরো চার পাঁচজন, শেষের দিকে ইউনুস আর আরো কয়েকজন। এমন সময় দূর থেকে পেছনে অনেকগুলো লাইট জ্বলে উঠে, আর শহিদ চিৎকার করে বলে -বস্তা ফালাইয়া ভাগো...।
আর সাথে সাথেই দুটো গুলির শব্দ।
এমন শব্দ ইউনুস আগেও শুনেছে কিন্তু এতো ভয়ঙ্কর মনে হয়নি। কি যেন লাগলো এসে পিঠে, সব অন্ধকার। কি যন্ত্রনা......
এর দুদিন পর ভারত দুটি লাশ ফেরত দেয়। একটি আমাদের ইউনুসের আরেকটি জালাল এর। ইউনুসের লাশ নিতে এসেছেন মেম্বার।
ইউনুস জানতো না, এমন ইউনুস প্রায়ই শুধু মারা যায় না, বরং মারা পড়ে, আর লাশ বিএসএফ ক্যাম্পে পঁচতে থাকে কয়েকদিন ধরে।
শুধুই যে অবৈধ মালামাল পরিবহনে ইউনুসের মত মানূষ মারা যায় তা নয়, অনেক অসহায় মানুষ সীমানার ওপারে আত্মীয়ের সাথেও দেখা করতে যান কিংবা জীবিকার তাগিদে যেতে হয় সেপারে।
পূনশচঃ
আশা করি, প্রাণঘাতী অস্ত্র না ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা পরীক্ষামুলক থাকবে না, বাস্তবিকভাবে কার্যকর হবে।